২৫-৩০ হাজারেও ৮ জিবি র‍্যামের ফোন কেন পাওয়া যাচ্ছে না?

২৫-৩০ হাজার টাকার ফোনেও ৮ জিবি র‍্যাম উধাও হওয়ার কারণ।

কয়েক বছর আগেও দেশের বাজারে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বাজেটের মধ্যে ৮ জিবি র‍্যাম ও বেটার প্রসেসর ও বেশ ভালো স্পেক পাওয়া যেতো। অথচ এখন বাজারে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে গেলেও ফিজিক্যাল ৮ জিবি র‍্যামের ফোন খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

মূলত টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির কারণে মেমোরি চিপের সংকট, বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাবে কাঁচামালের দাম বাড়া এবং ফোন কোম্পানিগুলোর ভার্চুয়াল র‍্যামের মার্কেটিং কৌশলের কারণেই দেশের স্মার্টফোন বাজারে এই পরিবর্তন এসেছে।

Advertisement

হঠাৎ করে বাজেট স্মার্টফোন বাজারের এই উল্টো পথে হাঁটার পেছনে নির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কারণ কাজ করছে।

১. ডলারের দাম ও টাকার মান কমে যাওয়া

সবচেয়ে বড় এবং সরাসরি কারণটি হলো আমাদের টাকার অবমূল্যায়ন। বছর তিনেক আগেও যখন এক ডলার সমান ৮৫ বা ৮৬ টাকা ছিল, তখন ১৫ হাজার টাকায় প্রায় ১৭৫ ডলার মূল্যের একটি ফোন কেনা যেত। এখন ডলারের দাম ১২০ টাকার আশেপাশে। অর্থাৎ সেই একই ১৭৫ ডলারের ফোনটির দাম এখন স্বাভাবিকভাবেই ২১ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে স্মার্টফোন আমদানিতে বাড়তি শুল্ক ও ভ্যাট। ফলে আগে যে কনফিগারেশনের ফোন আমরা ১৫-২০ হাজার টাকায় কিনতাম, ডলারের হিসেবে সেটির বর্তমান বাজারমূল্যই এখন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

Advertisement

২. এআই (AI) বিপ্লব এবং মেমোরি চিপের সংকট

বর্তমানে ৮ জিবি র‍্যামের ফোন কমে যাওয়ার পেছনে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার খুব বড় একটি ভূমিকা আছে। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইয়ের মতো এআই মডেলগুলো চালাতে বিশাল ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হয়, যেখানে লাগে এইচবিএম (High Bandwidth Memory) নামের বিশেষ র‍্যাম। বিশ্বের প্রধান মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স এবং মাইক্রন এখন সাধারণ ফোনের র‍্যাম বানানোর চেয়ে এআই সার্ভারের চিপ তৈরিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। কারণ ওখানে তাদের লাভের পরিমাণ অনেক বেশি। যার কারণে আমাদের ফোন এর র‌্যাম এর দাম তো বেড়েছেই একই সাথে ল্যাপটপ বা ডেসটপ এর র‌্যাম এর দাম ও বেড়েছে বেশ অনেকটাই।

তাই আমার কাছে যা মনে হচ্ছে, র‌্যাম এর মার্কেটে চাইনিজ কোম্পানি গুলো মেসিভ আকারে প্রোডাকশন শুরু করে তবে খুব দ্রুতই হয়তোবা এর পরিবর্তন আসতে পারে। তবে র‌্যাম উৎপাদন প্রসেসটা খুব একটা সহজ ও না।


৩. যুদ্ধ এবং সাপ্লাই চেইনে অস্থিরতা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা চিপ তৈরি থেকে শুরু করে ফোন হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। র‍্যাম বা সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরি করতে 'নিয়ন গ্যাস' এবং 'প্যালাডিয়াম' নামের দুটি উপাদান খুব জরুরি। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক সেমিকন্ডাক্টর-গ্রেড নিয়ন গ্যাস আসত ইউক্রেন থেকে, আর প্যালাডিয়ামের বড় উৎস রাশিয়া। যুদ্ধের কারণে এই কাঁচামালের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে লোহিত সাগরে উত্তেজনার কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হচ্ছে, যা পরিবহন ও জ্বালানি খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্মার্টফোনের উৎপাদন খরচে।

Advertisement

৪. ভার্চুয়াল র‍্যামের মার্কেটিং কৌশল

হার্ডওয়্যারের বাড়তি খরচ সামাল দিতে মোবাইল কোম্পানিগুলো এখন ‘ভার্চুয়াল র‍্যাম’ বা ‘র‍্যাম প্লাস’ প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে। তারা ফোনে মূল র‍্যাম ৪ জিবি বা ৬ জিবি দিয়ে, ফোনের স্টোরেজ থেকে আরও ৪ বা ৬ জিবি ধার নিয়ে বক্সের গায়ে ৮ জিবি বা ১২ জিবি র‍্যাম লিখে প্রচার করছে। সাধারণ ক্রেতারা এই বড় সংখ্যা দেখে আকৃষ্ট হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে স্টোরেজ দিয়ে তৈরি ভার্চুয়াল র‍্যাম কখনোই আসল ফিজিক্যাল র‍্যামের মতো পারফরম্যান্স দিতে পারে না। এই কৌশলে কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বাঁচলেও ক্রেতারা আসল ৮ জিবি র‍্যাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

৫. ৫জি এবং অন্যান্য ফিচারে খরচের কাটছাঁট

এখনকার ২৫-৩০ হাজার টাকার অনেক ফোনেই ৫জি প্রসেসর দেওয়া হচ্ছে, যার দাম সাধারণ ৪জি প্রসেসরের চেয়ে বেশি। তাছাড়া ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে কোম্পানিগুলো এই বাজেটেই অ্যামোলেড ডিসপ্লে, ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেট এবং ফাস্ট চার্জিং যুক্ত করছে। ফোনের মোট দাম ক্রেতাদের নাগালে রাখতে গিয়ে তারা র‍্যামের অংশ থেকে খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া নতুন প্রসেসরগুলোর সাথে তুলনামূলক উন্নত গতির র‍্যাম ও স্টোরেজ দিতে হয় বলে, খরচ বাঁচাতে র‍্যামের পরিমাণ ৮ জিবির বদলে ৬ জিবিতে নামিয়ে আনা হচ্ছে।

Advertisement

সব মিলিয়ে আমাদের টাকার মান কমে যাওয়া এবং বিশ্ববাজারে যন্ত্রাংশের দাম বাড়ার কারণে ২৫ হাজার টাকা এখন আর আগের মতো মিড-রেঞ্জ বাজেট নেই। এটি এখনকার স্মার্টফোন বাজারের নতুন এন্ট্রি-লেভেল বা প্রাথমিক বাজেটে পরিণত হয়েছে। তাই এই বাজেটে ফোন কেনার সময় বক্সের গায়ের ভার্চুয়াল র‍্যামের হিসাব না দেখে, ফোনে আসল ফিজিক্যাল র‍্যাম কতটুকু আছে তা যাচাই করে কেনা উচিত।

অস্থিরতার মধ্যেও বাজেট ফ্রেন্ডলি কিছু ফোন

বর্তমান মার্কেটের নাজুক অবস্থার পরেও মার্কেটে ফোন কোম্পানি গুলো আমাদের মতো মধ্যবিত্তকে এখন ‍ও ভুলে যায়নি পুরোপুরি। তাইতো বিশাল এই ভোক্তা শ্রেনির চাহিদা পুরনে হরহামেশাই বাজেট ফ্রেন্ডলি বেশ কিছু ফোন মার্কেটে নিয়ে আসে। এই যেমন : intel zeno 300 যদিও ফোনটি এখন বাংলাদেশে অফিশিয়ালি লঞ্চ হয়নি, তবে আশা করছি কয়েকদিন এর মধ্যে বাংলাদেশ মার্কেটেও পাওয়া যাবে। তাছাড়া Realme C100 ও চমৎকার একটি অপশন হতে পারে।
Chief Editor

Chief Editor

TechPortal Official • Verified Tech Author

Lead Tech Editor & Reviewer

Connect on Facebook →

Discussion (0)

No comments yet. Start the conversation!

Please Sign in or Register to join the discussion.